বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০১:২৭ অপরাহ্ন
মোঃ জসিম উদ্দিন, বিশেষ প্রতিনিধি, দৈনিক কালের খবর:
পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে যখন নতুন ভোরের সূর্য উঁকি দিচ্ছে, তখন সেই আলো নিয়ে কিছু বিতর্ক উঠুক—তাতে গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই প্রকাশ পায়। সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর পাহাড়ের ৩৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক যে যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন,তাকে আমি একপাক্ষিক আবেগ হিসেবেই দেখছি।পাহাড় মানেই কি কেবল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর একচেটিয়া অধিকার,নাকি সেখানে সমতলের মানুষের সঙ্গে এক নিবিড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংহতি গড়ে তোলা? আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির ঘ খণ্ডের১৯ধারায় উপজাতীয়দের মধ্য থেকে মন্ত্রী নিয়োগের যে বিধানের কথা বলা হয়েছে, সরকার রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ানকে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সেই শর্তের নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা ইতিমধ্যেই পূরণ করেছে।ফলে একজন অ-পাহাড়ি হিসেবে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে নির্বাচিত ব্যারিস্টার মীর হেলালকে প্রতিমন্ত্রী করা কোনোভাবেই চুক্তির পরিপন্থী হতে পারে না বরং পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার হাটহাজারীর সঙ্গে পাহাড়ের যে ভৌগোলিক ও বাণিজ্যিক সেতুবন্ধন রয়েছে, তা বিবেচনায় নিলে এই নিয়োগ অত্যন্ত কৌশলগত এবং অর্থনৈতিকভাবে দূরদর্শী।
পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসনব্যবস্থায় স্থানীয় পাহাড়াড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা অবশ্যই জরুরি,কিন্তু তাকে কি একটি ‘বদ্ধ কুঠুরি’ বানিয়ে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে? বাংলাদেশের মানচিত্রের দশ ভাগের এক ভাগ এই বিশাল পার্বত্য এলাকা কেবল পাহাড়ের মানুষের নয়, বরং ১৮ কোটি মানুষের সম্পদ। এখানে গত কয়েক দশকে কয়েক লক্ষ বাঙালি স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন,যারা এই মাটিরই সন্তান। তারেক রহমানের ঘোষিত ‘রেইনবো নেশন’ বা রংধনু জাতি দর্শনের মূল সৌন্দর্যই হলো অন্তর্ভুক্তিবাদ। সেখানে কেবল এক পক্ষকে খুশি রাখা মানে হলো অন্য পক্ষকে বৈষম্যের দিকে ঠেলে দেওয়া।রংধনুতে যেমন সাতটি রঙের সহাবস্থান থাকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনেও তেমনি পাহাড় এবং সমতলের অভিজ্ঞতার সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। ব্যারিস্টার মীর হেলাল পেশায় একজন আইনজ্ঞ; পাহাড়ের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হলো দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ভূমি বিরোধ।এই আইনি জট খুলতে একজন চৌকস আইনজীবীর যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিবৃত্তি প্রয়োজন,তা সমতলের একজন নেতার কাছ থেকে পাওয়া গেলে পাহাড়ের সাধারণ মানুষই আখেরে লাভবান হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের নিরিখে দেখলে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের জিডিপিতে অবদান বর্তমানে প্রায় ৩.৫ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু এই সক্ষমতাকে ১০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার বিশাল সুযোগ রয়েছে, যা কেবল অভ্যন্তরীণ সম্পদ দিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিদেশি বিনিয়োগ এবং সমতলের উন্নত অবকাঠামোর সঙ্গে পাহাড়ের সংযোগ। মীর হেলাল এমন একটি নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রতিনিধিত্ব করেন যা চট্টগ্রামের মূল বাণিজ্যিক হাবের খুব কাছে। পাহাড়ের অর্গানিক কৃষিপণ্য, যেমন ‘রেইনবো স্পাইস’ বা চাষের হলুদ-আদা যখন আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখে,তখন বন্দর নগরী চট্টগ্রামের সঙ্গে পাহাড়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংযোগ স্থাপন করাটা সময়ের দাবি। যারা বলছেন এই নিয়োগ রেইনবো নেশন ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক,তারা আসলে এই দর্শনের গভীরতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন।রেইনবো নেশন মানে কেবল নৃ-তাত্ত্বিক অধিকার নয়, বরং রাষ্ট্র কাঠামোর প্রতিটি স্তরে সবার সমঅধিকার এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে মেধার মূল্যায়ন।ব্যারিস্টার মীর হেলালের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এবং আইনি প্রজ্ঞা তাঁকে পাহাড়ের জটিল প্রশাসনিক কাঠামোর সংস্কারে এক অনন্য শক্তিতে রূপান্তর করবে।
অনেকে বলছেন পাহাড়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে পাহাড়ির অংশগ্রহণ জরুরি।কথাটি সত্য, কিন্তু একপাক্ষিক। পাহাড়ে বসবাসরত কয়েক লক্ষ বাঙালির ভাগ্য জড়িয়ে আছে এই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে।দীপেন দেওয়ানের মতো একজন অভিজ্ঞ পাহাড়ি নেতা যখন পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে পাহাড়ের আবেগ ও অধিকারের সুরক্ষা দেবেন,তখন মীর হেলালের মতো একজন আধুনিক মননসম্পন্ন তরুণ নেতা সেই আবেগকে অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রূপান্তর করবেন।এটি আসলে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’-এর একটি চমৎকার রাজনৈতিক উদাহরণ। পাহাড়ের শান্তি চুক্তি পরবর্তী সময়ে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল,তার অন্যতম কারণ ছিল পাহাড় ও সমতলের মধ্যে আস্থার অভাব। মীর হেলালের মতো একজন নেতা, যার শিকড় চট্টগ্রামে অথচ যার দৃষ্টি আগামীর বাংলাদেশের দিকে, তিনি পারেন সেই আস্থার সংকট দূর করতে। আসলে পাহাড়ে এখন আর কেবল অস্ত্রের রাজনীতি নেই,সেখানে এখন শুরু হয়েছে অর্থনীতির রাজনীতি।এই নতুন অধ্যায়ে মীর হেলালের নিয়োগ কেবল পদায়ন নয়, বরং এটি একটি বার্তাও বটে—যেখানে রাষ্ট্র সবাইকে সমান চোখে দেখছে।
আমরা যদি বিগত বছরগুলোর পরিসংখ্যান দেখি, পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারি বরাদ্দের প্রায় ৬০ শতাংশই যথাযথ ব্যবহারের অভাবে ফেরত গেছে অথবা নামমাত্র উন্নয়নে ব্যয় হয়েছে। এর পেছনে ছিল প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাব এবং এক ধরনের গোষ্ঠীতান্ত্রিক রাজনীতির প্রভাব।একজন তরুণ ব্যারিস্টার যখন এই মন্ত্রণালয়ে বসবেন, তখন তিনি স্বভাবতই স্বচ্ছতা এবং আইনি কাঠামোর ওপর জোর দেবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্যই হলো প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা। মীর হেলাল সেই জবাবদিহিতার প্রতিনিধি হিসেবে পাহাড়ের উন্নয়নের প্রতিটি টাকা যেন প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে পারবেন।পাহাড়ের মানুষ এখন ক্লান্ত। তারা আর রাজনৈতিক স্লোগানের মারপ্যাঁচে আটকা থাকতে চায় না। তারা চায় কর্মসংস্থান,চায় তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য। চট্টগ্রামের হাটহাজারীর সঙ্গে পাহাড়ের বাণিজ্যিক যে সংযোগ, তা মীর হেলালের মাধ্যমে এক নতুন মাত্রা পাবে। হাটহাজারী ও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা পাহাড়ের ট্যুরিজম ও অ্যাগ্রো-ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগ করতে উৎসাহী হবেন যদি তারা প্রশাসনিকভাবে একজন পরিচিত ও দক্ষ অভিভাবক পান।
রেইনবো নেশন দর্শন কখনোই বলে না যে,পাহাড়ের দায়িত্বে কেবল পাহাড়িরাই থাকবে। বরং এটি বলে যে,পাহাড় ও সমতলের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তুলবে।মীর হেলালের নিয়োগ সেই সংহতিরই বহিঃপ্রকাশ। যদি আমরা সমতলের কোনো মন্ত্রণালয়ে কেবল সেই অঞ্চলের মানুষকে মন্ত্রী করার দাবি তুলতাম,তবে তা যেমন হাস্যকর হতো, পাহাড়ের ক্ষেত্রেও বিষয়টি তাই। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে দক্ষতা ও মেধার চেয়ে পরিচয় বড় হয়ে উঠলে তা শেষ পর্যন্ত জনমানুষের ক্ষতিই ডেকে আনে। মীর হেলাল চট্টগ্রাম-৫ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে পাহাড়ের ভৌগোলিক প্রতিবেশ সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন।তাঁর এই ভৌগোলিক নৈকট্য পাহাড়ে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর তদারকিতে বাড়তি গতি যোগ করবে। বিশেষ করে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির সংযোগস্থলে যেসব উন্নয়ন কাজ স্থবির হয়ে আছে,তা নিরসনে তাঁর ভূমিকা হবে ত্বরান্বিত।
পাহাড়ের হদস্পন্দন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গতিশীল।সেখানে এখন কেবল চাষাবাদ নয়,গড়ে উঠছে স্মার্ট কটেজ আর জিরো-কার্বন ট্যুরিজম জোন।অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এ প্রকাশিত পাহাড়ের হৃদস্পন্দন: তারেক রহমানের রেইনবো নেশন ও আগামীর পার্বত্য চট্টগ্রাম’বইটিতে যেভাবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পাহাড়ের স্বপ্ন দেখানো হয়েছে,মীর হেলালের নিয়োগ সেই স্বপ্নেরই একটি বাস্তব প্রতিফলন। পাহাড়ের মানুষ যে অধিকারের কথা বলে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় অধিকার হলো উন্নয়নের অংশীদার হওয়া। আর সেই অংশীদারিত্ব কেবল একজন উপজাতীয় মন্ত্রীর মাধ্যমে সম্ভব নয়,তার জন্য প্রয়োজন জাতীয় রাজনীতির মূল ধারার সঙ্গে নিবিড় সম্পৃক্ততা। মীর হেলাল সেই মূল ধারার প্রতিনিধি।তিনি যেমন পাহাড়িদের আবেগ বুঝবেন, তেমনি সমতলের বাঙালির অধিকারের ভারসাম্য রক্ষা করবেন।শান্তি চুক্তির ১৯ ধারাকে সংকীর্ণভাবে ব্যাখ্যা না করে যদি এর মূল সুর—অর্থাৎ পাহাড়ে শান্তি ও প্রগতি ফিরিয়ে আনা—বিবেচনায় নেওয়া হয়, তবে দেখা যাবে সরকারের এই সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিকভাবে মাস্টারস্ট্রোক।
সবশেষে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তই একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। পাহাড়কে একঘরে করে রাখা কিংবা পাহাড়ের নামে কেবল গুটিকয়েক নেতার আখের গোছানোর দিন শেষ হয়ে আসছে।এখন সময় হয়েছে পাহাড়কে বাংলাদেশের মূল অর্থনৈতিক স্রোতধারায় মিশিয়ে দেওয়ার।ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের মতো একজন মেধাবী ও দক্ষ মানুষকে এই গুরুদায়িত্ব দেওয়া প্রমাণ করে যে,সরকার পাহাড়ের সমস্যাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। বিশিষ্ট নাগরিকের উদ্বেগ আমরা আমলে নিচ্ছি, কিন্তু একই সঙ্গে পাহাড়ের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির যে আকাঙ্ক্ষা,তাকেও আমাদের সম্মান জানাতে হবে। মীর হেলাল কেবল একজন প্রতিমন্ত্রী নন,তিনি পাহাড় ও সমতলের মধ্যে রচিত এক নতুন সেতুবন্ধন। তাঁর হাত ধরেই আগামীর পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে উঠবে এক সত্যিকারের ‘রেইনবো নেশন’—যেখানে মেঘের আনাগোনা আর সবুজের হাতছানির নিচে কেউ বঞ্চিত হবে না, সবাই পাবে এক উন্নত ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা।